রবিবার ১৪ জুন ২০২৬
Online Edition

অর্থনৈতিক কূটনীতি : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ 

মোস্তাফিজুর রহমান

বিদেশে বাংলাদেশের প্রতিটি মিশন অফিস এবং তার সঙ্গে সংযুক্ত রাষ্ট্রদূতগণ সরাসরি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। এক অর্থে তারা দেশের ব্রান্ড এ্যাম্বাসেডরও। তাদের মাধ্যমেও বহির্বিশে^ দেশের ব্রান্ডিং হয়। দেশের রপ্তানি বাণিজ্য সম্প্রসারণ হয়। তারা তাদের নিষ্ঠাবান দায়িত্বের মাধ্যমেই বিদেশে নিজ দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বৃদ্ধি করতে পারেন। অর্থনৈতিক কূটনীতিকরা বিদেশের অর্থনৈতিক নীতিগুলোর ওপর সাধারণত নজরদারি করে থাকে। সেইসাথে নিজ সরকারের কাছে তারা রিপোর্ট করে কিভাবে বৈদেশিক নীতিগুলোর সর্বোচ্চ মাত্রায় ব্যবহার করে নিজ দেশের স্বার্থ রক্ষা করা যায়। বর্তমান বিশ^কে ভাবা হচ্ছে একটি গ্লোবাল ভিলেজ হিসেবে। তুমুল প্রতিযোগিতামূলক বিশ^ অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এখন আর শুধু ভূ-রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুতেই বিশ^ কূটনীতি বন্দী নয়। এর বাইরেও নানাবিধ কূটনৈতিক কলাকৌশল দেশগুলোকে রপ্ত করতে হচ্ছে। হয়ত সেই কারণে অর্থনৈতিক কূটনীতিকে একপ্রকার ‘অর্থনৈতিক রাষ্ট্রীয় শিল্প ’ বলা হচ্ছে। চরম বাস্তবতায় এখন বিশে^র অনেক দেশ অর্থনৈতিক কূটনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশ^ অর্থনীতিতে নিজেদের অবস্থান দীর্ঘ মেয়াদে বহুমুখী ও টেকসই করতে নানাবিধ পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে তারা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। অর্থ থাকলে অর্থনৈতিক পরাশক্তির পাশাপাশি সামরিক বা রাজনৈতিক পরাশক্তিও হওয়া যায়।

বিশ^ রাজনীতি ও অর্থনীতিতে মোড়লীপনা করা যায়। বাংলাদেশ তৃতীয় বিশে^র স্বল্পোন্নত একটি দেশ। বাংলাদেশও নিজেকে উন্নত দেশের কাতারে দেখতে চায়। এটি বাংলাদেশের স্বপ্নও। কিন্তু শুধু স্বপ্নবাজ হলেই সব হয়ে যায় না। প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা, সুদক্ষ ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়নের জ্ঞান। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের ক্যাটাগরি থেকে সম্পূর্ণরূপে বেরিয়ে যাবে। এটি একদিকে যেমন মর্যাদাকর তেমনি বেশ চ্যালেঞ্জেরও। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থার এই পর্যায়ভিত্তিক পরিবর্তন হলে তাকে অনেকগুলো বাস্তবভিত্তিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। যেমন-বিশ^বাজারে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বর্তমানে ৪৩টি পণ্য রপ্তানিতে প্রণোদনা বা নগদ সহায়তা দিয়ে আসছে। স্বল্পোন্নত থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটলে যা আর থাকবে না। অর্থাৎ বাংলাদেশ তখন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাবে। তখন প্রচলিত শুল্ককর দিয়েই বাংলাদেশকে ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে পণ্য রপ্তানি করতে হবে। এর ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় প্রায় ১৪ দশমিক ২৮ শতাংশ কমে যাবে বলে বিশ^ বাণিজ্য সংস্থা তাদের এক হিসাবে দেখিয়েছে। টাকার হিসাবে যা প্রায় à§«à§§ হাজার কোটি। 

রপ্তানি আয়ের এই বিশাল ঘাটতির বিষয়টি বাংলাদেশকে ভাবাচ্ছে। সঙ্গত কারণে, বিশ^ অর্থনীতিতে অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে জাতীয় আয় বৃদ্ধির বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব পাচ্ছে। অন্যান্য সব দেশ যখন অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে তাদের দেশের ভাবমূর্তির পাশাপাশি বাণিজ্য সম্প্রসারণে নানাবিধ পরিকল্পনায় এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম হতে পারে না। তবে সূত্রমতে, রপ্তানি বাণিজ্যে বিদেশে বাংলাদেশী মিশনগুলোর কর্মদক্ষতা সন্তোষজনক নয়। কোনো কোনো দেশে বাংলাদেশী মিশনের পারফরমেন্স বেশ হতাশাজনক। অথচ ওইসব দেশে বাংলাদেশের বিশেষ বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে। সূত্র থেকে জানা যায়, বিদেশে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন রয়েছে ৮২টিরও বেশি। যার মধ্যে ৫৯টি দূতাবাস বা হাইকমিশন, ২০টি কনস্যুলার মিশন এবং নিউইয়র্ক এবং জেনেভাতে দুটি স্থায়ী মিশন। সরকারের রপ্তানি বাণিজ্য নীতিমালার অংশ হিসাবে বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোকেও কিছু কিছু রপ্তানি টার্গেট গ্রহণ ও তা পূরণ করতে হয়।

সূত্র বলছে, বিস্তৃত রপ্তানি বাণিজ্যের সম্ভাবনাময় বাজার থাকা সত্ত্বেও অনেকগুলো মিশন তাদের জন্য নির্ধারিত টার্গেট অর্জনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। ব্যর্থ হওয়া এই মিশন অফিস হলো : লন্ডন, ব্রাসেলস, বেইজিং, মাদ্রিদ, জেনেভা, প্যারিস, তেহরান, নয়াদিল্লী, টোকিও, নমানামা, ব্রাসিলিয়া, এথেন্স, হংকং, বৈরুত, মেক্সিকো সিটি, কাঠমান্ডু, লিসবন, রোম, ম্যানিলা, বাগদাদ, রিয়াদ, স্টকহোম, নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন, অটোয়া, বার্লিন, সিউল, আলজিয়ার্স, কুয়েত, দোহা, মালে, দ্য হ্যাগ এবং হ্যানয়। দু:খজনক হলেও সত্য ইউরোপ-আমেরিকার মতো দেশগুলোতে বিশাল বাজার থাকার পরও শুধু গাফিলতি ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে এবং যথাযথ জবাবদিহিতার অভাবে মিশনগুলো তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। অভিজ্ঞ মহল বলছে, যথাযথ কূটনৈতিক পেশাদারিত্ব এবং কাজের জবাবদিহিতা না থাকায় অনেকে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের বিষয়টি তেমন গুরুত্ব দেন না। এছাড়া, কূটনৈতিক মিশনগুলোতে দলীয় পরিচয়ে যাকে তাকে নিয়োগ প্রদান করাও একটি বড় সমস্যা। 

বিগত আওয়ামী স্বৈরাচারি সরকার অনেক মিশনে অপেশাদার, অনভিজ্ঞ লোকদের নিয়োগ দিয়েছেন। যারা দেশের আর্থিক লাভের বদলে অনেক কলঙ্ক বয়ে এনেছেন। নষ্ট করেছেন দেশের ভাবমূর্তি, মর্যাদা। তারা নারী কেলেঙ্কারিসহ নানান অপকর্মে জড়িয়েছেন। বিদেশে মিশন মানে প্রবাসে এক টুকরো বাংলাদেশ। প্রিয় মাতৃভূমির লাল-সবুজের পতাকা। মিশন অফিসকে দেশের হয়ে প্রবাসীদের সেবা প্রদান করতে হয়। প্রবাসীদের বিপদে-আপদে এগিয়ে এসে তাদের পাশে দাঁড়াতে হয়। কিন্তু অনেক মিশনের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট দেশের প্রবাসীদের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। শোনা যায়, তারা ঠিকমত সেবা দেন না। কোথাও কোথাও হয়রানির মতো অভিযোগও পাওয়া যায়। এইসব মিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, দায়িত্বপ্রাপ্তরা প্রবাসে অবকাশ-বিনোদন-কেনাকাটা নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকেন। ব্রিটেনের অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ইকোনমিকস্ এন্ড বিজনেস রিসার্চ বলেছে, বাংলাদেশের চলমান অর্থনৈতিক গতিধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সাল নাগাদ দেশটি হবে বিশে^র ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। সংস্থাটি বলছে, ২০২০ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে বিশ^ অর্থনীতির সূচকে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার অর্থনীতি।  ডলার স্থিতি  এখন অত্যন্ত নাজুক। এই মুহূর্তে দেশে দ্রুত শিল্পায়ণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং উচ্চতর দক্ষতা ও জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে বিদেশী বিনিয়োগের এজন্য বিদেশে বাংলাদেশী মিশন প্রধানদের অর্থনৈতিক কূটনীতিতে বিশেষ পেশাদার কূটনীতির ভূমিকা পালন করতে হবে। আমরা জানি, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির গুচ্ছমালায় পাঁচটি অংশ রয়েছে। যেমন : ১। অধিকতর বৈচিত্র্যময় বাণিজ্য ও রপ্তানি ২। আরো বিদেশী বিনিয়োগ ৩। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবসম্পদের জন্য লাভজনক কর্মসংস্থান ৪। প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং ৫। উচ্চমানের পরিষেবা বাংলাদেশী প্রবাসী এবং অন্যান্য। প্রতিযোগিতামূলক অর্থনৈতিক বিশ^ ব্যবস্থায় মিশন প্রধানদের জবাবদিহিতার আওতায় এনে তাদের দক্ষতা ও কাজের সক্ষমতা বাড়তে পারলে অর্থনৈতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশ সফল হবে বলে আশা করা যায়। বাংলাদেশের রপ্তানি বহরে ইতোমধ্যে অনেকগুলো পণ্য বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। তার বাইরেও অনেক অপ্রচলিত পণ্য রয়েছে। পরিকল্পনা মাফিক সেগুলোর প্রচার-প্রসার করা গেলে নি:সন্দেহে তারও রপ্তানি বাড়বে। অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে প্রাপ্ত আয় কর-বহির্ভূত একটি রাজস্ব আয়। উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে কর-বহির্র্ভূত আয় সরকারি আয়ের একটি প্রধান উৎস। চীনের মোট রাজস্বের ৪০ শতাংশ হচ্ছে কর-বহির্ভূত আয়। মালয়েশিয়ায় যা ২৭ শতাংশ। সার্কভুক্ত ভূটানে তা ২৮ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশে এটি à§§à§§ শতাংশ। 

২০২১ সালের পহেলা জানুয়ারিতে আফ্রিকায় শুরু হয়েছে বিশে^র বৃহত্তম মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল (এফটিএ)। এই চুক্তির প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে, আফ্রিকা মহাদেশের ১২ কোটি মানুষকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসা। আফ্রিকার ৫৫টি দেশের সবকটিতে এই চুক্তি কার্যকর হলে তাদের মধ্যকার বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়াবে ৪ লাখ কোটি ডলার। বিশাল আকারের এই বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এখনি দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট মিশনগুলোকে দেশীয় পণ্যের বিশাল ভান্ডারকে ওই অঞ্চলের বাজারে পরিচিত করে তুলতে হবে। নিজ দেশের পণ্যের ব্যাপক প্রচার-প্রসার চালাতে হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে বাংলাদেশের মিশনগুলোকে সুপরিকল্পিত ও কার্যকর পন্থায় এগিয়ে যেতে হবে। করোনাজনিত বিশ^ মহামারির পর ২০২১ সালে বিশ^ অর্থনীতিতে চমক সৃষ্টি করে চীন এখন বিশে^র অর্থনৈতিক পরাশক্তিরূপে আবিভূর্ত হয়েছে। ওই সময়ে চার দশক পরে বিশে^র শীর্ষ অর্থনীতির আসনটি হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একবারে দ্বিতীয় অবস্থানে থেকে এক নম্বরে উঠে এসেছে দেশটি। এশিয়ায় চীনের এই বিষ্ময়কর অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ চীনের সাথে বহুমুখী বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে।

বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনুসকে জাতিসংঘ, বিশ^ব্যাংক, আইএমএফসহ পশ্চিমা বিশ^ উষ্ণ আলিঙ্গনে শুধু গ্রহণই করেনি, তার সরকারকে সর্বোচ্চ মাত্রায় সহযোগিতার আশ^াসও দিয়েছেন। ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশ ও দাতা সংস্থা বড় অংকের আর্থিক সাহায্যের কথা ঘোষণা করেছেন। বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতি নাজুক অবস্থানে। 

 

আশা করা যায়, ইউনুস সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সময় পেলে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবেন। তার আগে বিদেশী মিশনগুলোকে ঢেলে সাজাতে হবে। মিশনগুলোতে নিয়োগকৃত অদক্ষ, অযোগ্য ব্যক্তিদের স্থলে অভিজ্ঞ, পেশাদার, দেশপ্রেমিক কূটনীতিকদের নিয়োগ দিতে হবে। তারা যাতে সততা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে বিদেশে বাংলাদেশের ভাবভূর্তি উজ্জ্বল করার পাশাপাশি দেশীয় পণ্যের বিস্তৃত বাজার সৃষ্টি করতে পারে। মনে রাখতে হবে, তারা যেমন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তেমনি তারা এদেশের পণ্যদূতও। দেশের পণ্যের সুবিস্তৃত বাজার সৃষ্টি করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে তারা বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারেন। তবে বাংলাদেশের মিশনগুলোর অতীত কর্মতৎপরতা বলে দেয় বৈশি^ক অর্থনৈতিক কূটনীতিতে তারা পিছিয়ে আছেন। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ